ফ্রান্সে এক্স অফিসে হানা, গ্রোক নিয়ে যুক্তরাজ্যের নতুন তদন্ত
ইলন মাস্কের জন্য সময়টা মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একরত্তি স্বস্তি নেই তার সোশ্যাল মিডিয়া সাম্রাজ্যে। এবার খোদ প্যারিসে মাস্কের মালিকানাধীন ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এর কার্যালয়ে হানা দিয়েছে ফরাসি পুলিশ। প্যারিস প্রসিকিউটরের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এই আকস্মিক অভিযানে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বে।
অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ এবং ভারী। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং শিশু পর্নোগ্রাফির মতো সংবেদনশীল কনটেন্ট ছড়ানোর ক্ষেত্রে পরোক্ষ সহযোগিতা বা নিষ্ক্রিয়তা। এখানেই শেষ নয়, মাস্ক এবং এক্সের সাবেক সিইও লিন্ডা ইয়াকারিনোকে এপ্রিল মাসে শুনানির জন্য তলবও করা হয়েছে।
বিপদ যেন একদিক থেকে আসছে না।
ঠিক একই সময়ে যুক্তরাজ্যের ইনফরমেশন কমিশনারস অফিস (আইসিও) মাস্কের এআই টুল ‘গ্রক’ (Grok)-এর ওপর তদন্তের খড়গ নামিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই এআই ব্যবহার করে ক্ষতিকর ও যৌন উসকানিমূলক ডিপফেক ছবি তৈরি করা হচ্ছে, যা ব্যক্তি গোপনীয়তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই এর কড়া জবাব দিয়েছেন ইলন মাস্ক। এক্স-এ এক পোস্টে তিনি এই পুরো ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক আক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তারা হতাশ হলেও মোটেও অবাক নন। ফরাসি প্রসিকিউটরের এই পদক্ষেপকে তারা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ এবং বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে দাবি করেছেন।
তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, যখন ফরাসি কৌঁসুলিরা এক্সের অ্যালগরিদম নিয়ে ঘাঁটাঘাটি শুরু করেন। জুলাই মাসে সেই তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে মাস্কের বিতর্কিত চ্যাটবট ‘গ্রক’-কে এর আওতায় আনা হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের সন্দেহ, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে অবৈধ ডেটা এক্সট্রাকশন এবং ডিপফেক ইমেজের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটছে এই প্ল্যাটফর্মে, যেখানে এক্স কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
বিষয়টি এখন আর কেবল প্রযুক্তির গণ্ডিতে আটকে নেই।
সাবেক সিইও লিন্ডা ইয়াকারিনোও ছেড়ে কথা বলেননি। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ফরাসি প্রসিকিউটররা মার্কিনিদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ চরিতার্থ করছেন। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটররা মিথ্যা বলছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যের অফকম (Ofcom) জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিশেষ করে নারীদের সম্মতি ছাড়া তাদের ছবি ব্যবহার করে গ্রক-এর মাধ্যমে বিকৃত ও অশ্লীল ছবি তৈরির বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আইসিও-র নির্বাহী পরিচালক উইলিয়াম ম্যালকম জানান, ব্যবহারকারীদের অজান্তে তাদের ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করে এ ধরনের ছবি তৈরি করা হচ্ছে কি না এবং তা রোধে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি না—সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।
ইউরোপিয়ান কমিশনও বসে নেই। তারাও মাস্কের কোম্পানি এক্সএআই (xAI)-এর বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের প্রসঙ্গটি প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসছে। তিনিও ফরাসি কর্তৃপক্ষের এই আচরণের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ফ্রান্সকে এমন একটি দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর টুঁটি চেপে ধরতে চায়। উল্লেখ্য, দুরভ নিজেও গত বছর ফ্রান্সে আটক হয়েছিলেন এবং তাকেও অ্যাপের কনটেন্ট মডারেশন নিয়ে আইনি ঝামেলার পোহাতে হয়েছে।
ইউরোপের মাটিতে ‘বিগ টেক’ কোম্পানিগুলোর লাগাম টানতে যে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, প্যারিসের এই অভিযান তারই এক বড় সংকেত। মাস্কের ‘ফ্রি স্পিচ’ বনাম ইউরোপীয় আইনের এই লড়াই কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।