মুসান্না মেহবুব

প্রকাশিত:
১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৩:৪৪ পিএম


রোহিঙ্গাদের একটি অংশের বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ার পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে কারা?


রোহিঙ্গাদের একটি অংশের বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ার পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে কারা?

মিয়ানমার থেকে ইতিহাসের নৃশংসতম নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি অংশ ক্রমশ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে। জড়াচ্ছে মাদক, চোরাচালান ও ডাকাতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে হরহামেশাই লিপ্ত হচ্ছে বিবাদে।

উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানাচ্ছেন, রোহিঙ্গাদের ৩০টি আশ্রয় শিবির রয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ায় ২৩ ও টেকনাফে ৭টি। যেখানে গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও স্থানীয়দের সঙ্গে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় ৪ শতাধিক মামলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ২২টি অস্ত্র মামলায় ৩৯ জন, শতাধিক মাদক পাচার মামলায় ১৫২ জন, ১২টি ধর্ষণ মামলায় ২০, ১০টি বৈদেশিক আইনের মামলায় ১২, ৪টি অপহরণ মামলায় ২৫, ৫টি চোরাচালান মামলায় ১০, ২টি চুরি মামলায় ৩, ৬টি ডাকাতি প্রস্তুতি মামলায় ১৯, ২২টি হত্যা মামলায় ৬১ এবং অন্যান্য ৯৬টি মামলায় আরও ১৮২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তবে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফের সব রোহিঙ্গা শিবিরে যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, এমন না। কয়েকটি শিবিরে কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছে কিছু অসাধু রোহিঙ্গা চক্র। এবং এটা তারা করতে পারছে স্থানীয় ও এদেশি কিছু দুষ্ট লোকের সহায়তায়। তাদের জন্য সব রোহিঙ্গার দুর্নাম হচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের এই অপরাধী চক্রের উৎপাতে স্থানীয় মানুষজনের ভেতর বিতৃষ্ণার জন্ম হয়েছে। একই সঙ্গে বিরক্তিরও। পাশাপাশি তাদের অপরাধপ্রবণতার কারণে সারা দেশে ঢালাওভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর একটা বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চরম নিষ্পেষণের শিকার হয়ে সহায়-সম্বল সব ফেলে রেখে যখন এই মুসলিম জনগোষ্ঠী বানের জলের মতো বাংলাদেশে ঢুকে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন পুরো দেশ থেকেই মানবিকতার তাগিদে তাদের সাহায্যে ছুটে গিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। তাঁদের মধ্যে ওলামায়ে কেরামের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সেই সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি পুরো দেশেই বিরাজ করছিল এক ধরনের সহমর্মিতা।

কিন্তু বছর দুই পরে এখন সেই সহমর্মিতার অনেকখানিই বিদ্বেষ ও বিরক্তিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে তাঁদের সাধারণ জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। এরা নানা প্রকারের অপরাধ এবং উশৃংখলতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

রোহিঙ্গাদের এই অপরাধপ্রবণতা ও তাদের প্রতি তৈরি হওয়া বিদ্বেষ বিষয়ে কথা বলেছিলাম রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিভিন্নভাবে সহায়তাপ্রদানকারী আলেম গাজী ইয়াকুবের সাথে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাপনে বড় ধরনের বিঘ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাপারগুলো সত্য। তবে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত, যে জনগোষ্ঠী শতাব্দীর নৃশংসতম নির্যাতনের কবল থেকে বেরিয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক ও তাহজিব-তামাদ্দুনের দিকটা খুবই বিপর্যস্ত। তাদের সিংহভাগই নিতান্তই অক্ষরজ্ঞানহীন। এরা দীর্ঘ একটা সময়, প্রায় ৬০ বছরের মতো অনেকটা বন্দীর মতো জীবনযাপন করেছে মিয়ানমারে। নিজের ভূমিতে নিজেরা কারাগারবাস করেছে। পাঁচ কিলোমিটার সীমানার বাইরে তাদের যাতায়াত নিষিদ্ধ ছিল। সরকার নাগরিকত্ব তো কেড়ে নিয়েছেই, উপরন্তু শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা তাহজিব তামাদ্দুন চর্চার নূনতম সুযোগ দেয়নি৷ ফলে এদের ৮০ ভাগ মানুষই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর ধরে মূর্খতার ভেতর বাস করছে। মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়, এটা তাদের অজানা। অশিক্ষার এই আধারই রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে।

গাজী ইয়াকুব বলেন, ‘তবে তাদের এই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে কিছু এনজিও সংস্থা ও দেশীয় দুষ্ট চক্রের পৃষ্ঠপোষণ ও ইন্ধন রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম ভাঙিয়ে বহির্বিশ্ব থেকে শত শত কোটি টাকা ত্রাণ সহায়তা নিয়ে আসছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান। এসব টাকার কত পার্সেন্ট খরচ করা হয় রোহিঙ্গাদের পেছনে? অল্পকিছু খরচ করে বাকি বিশাল অংকের এমাউন্ট পকেটে ঢুকে ওই সব এনজিও’র হর্তাকর্তাদের। তাই তারা চায় রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে রাখতে। আর এজন্য এদেরকে অশান্ত করে তুললে মিয়ানমার সরকার এদেরকে ফেরত নেবে না, সংকট দীর্ঘায়িত হবে। তাদেরও পকেটে ঢুকতে থাকবে বিদেশি ডলার

গাজী ইয়াকুব বলেন, নির্দিষ্ট কিছু সংস্থা রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেবার মূলে রয়েছে। এরাই নানা প্রকারের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে নানা ধরনের অরাজকতায় লিপ্ত করে। এদের মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে লিয়াজো আছে অনেকের। রোহিঙ্গাদের কিছু সদস্যকে অস্ত্র দিয়ে মারমুখো করতে পারলে, মিয়ানমার সরকার তাদের ওপর নিপীড়নের একটা অজুহাত দাঁড় করাতে পারবে যে, এরা উচ্ছৃঙ্খল ছিল, তাই আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি।

গাজী ইয়াকুব আরও বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের ছোট্ট দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক। কিন্তু দেশে ফেরত পাঠানোর নামে যদি আমরা তাদের মিয়ানমারের হাতে তুলে দিই, তাহলে মিয়ানমারে আরেকটা গুয়েন্তানামো বে কায়েম হবে। কারণ মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হলেও এখন পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের সেখানে নিয়ে তারা সরকারি একটা ক্যাম্পে রাখবে। নির্দিষ্ট এরিয়ার বাইরে তাদের যেতে দেওয়া হবে না। এটা কেমন করে হয়? কে মেনে নেবে এমন অন্যায়? রোহিঙ্গাদের সুনির্দিষ্ট আবাসস্থল এবং এলাকা ছিল, প্রত্যেকের জমিজমা ও ভিটেমাটি ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে এখন কারাগারের মতো একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে! তারচেয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকাই তো ভালো। রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলেই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চায়, তবে সেটা তাদের জায়গাজমি ফেরত পাওয়া ও নাগরিকত্ব লাভের শর্তে। নইলে ফেরত যাওয়া মানে যে দুনিয়ার জাহান্নামে পতিত হওয়া, সেটা সকলেই বুঝতে পারছেন। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে, রোহিঙ্গাদের এসব দাবি নিয়ে ভাবা এবং তাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা।


আপনার মতামত লিখুন :
বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর

আরো পড়ুন
ডিবি পরিচয়ে মাদরাসাছাত্রকে গুম, তিনদিন ধরে মিলছে না কোনো খোঁজ

ডিবি পরিচয়ে মাদরাসাছাত্রকে গুম, তিনদিন ধরে মিলছে না কোনো খোঁজ

তিন দিন ধরে নিখোঁজ তরুণ এক মাদরাসাছাত্র। চরম উৎকণ্ঠা ও…

পুঁথির মতো সুন্দর ২০১৯ এ ৩য় সেরা বাংলাবিদ অয়ন চক্রবর্তী গল্প : অর্ক রায় সেতু

পুঁথির মতো সুন্দর ২০১৯ এ ৩য় সেরা বাংলাবিদ অয়ন চক্রবর্তী গল্প : অর্ক রায় সেতু

অয়ন চক্রবর্তী, গুরুগম্ভীর মানুষের তালিকায় পাঠকের কাছে তার নাম লিখলে…

অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে পরিবারের হাতেই খুন দিরাইয়ের শিশু তুহিন
পুলিশের ধারণা

অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে পরিবারের হাতেই খুন দিরাইয়ের শিশু তুহিন

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে শিশু তুহিন আহমদ (৫)-কে বীভৎস কায়দায় হত্যাকে পারিবারিক…

জীবনটা গল্প হলেও পারতো- রিজন আহমেদ: জানাচ্ছেন অর্ক রায় সেতু

জীবনটা গল্প হলেও পারতো- রিজন আহমেদ: জানাচ্ছেন অর্ক রায় সেতু

আরজে রিজন, পুরো নাম রিজন আহমেদ একই সাথে তিনি এ…

‘কৃষ্ণের দশম অবতারে’র আশ্রমে মিলল ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

‘কৃষ্ণের দশম অবতারে’র আশ্রমে মিলল ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

নিজেকে কৃষ্ণের দশম অবতার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কিন্তু একসময় ছিলেন…

বিকাল পাঁচটায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

বিকাল পাঁচটায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী…

তুহিন হত্যার সঙ্গে তার বাবা’র সম্পৃক্তির কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না তুহিনের মা

তুহিন হত্যার সঙ্গে তার বাবা’র সম্পৃক্তির কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না তুহিনের মা

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় পাঁচ বছরের শিশু তুহিন হত্যাকাণ্ডে বাবা আব্দুল…

ভোলায় চার মুসল্লির শাহাদাতের ঘটনায় সিলেটে দফায় দফায় বিক্ষোভ

ভোলায় চার মুসল্লির শাহাদাতের ঘটনায় সিলেটে দফায় দফায় বিক্ষোভ

ভোলায় হিন্দু যুবক কর্তৃক ইসলাম ও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া…