রাগিব রব্বানি

প্রকাশিত:
১৫ জুন, ২০১৯ ০২:৩১ পিএম


ব্যয় ও দুর্ভোগে দিশেহারা ভুক্তভোগীরা

বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত ক্যান্সার-চিকিৎসা-সেবা


বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত ক্যান্সার-চিকিৎসা-সেবা

ক্যান্সার রোগটা কেবল মরণব্যাধিই না, একই সঙ্গে পুরো একটা পরিবারকে আর্থিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার জন্যও যথেষ্ট। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মরণব্যাধি ক্যান্সার পুরো একটা পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের যে কোনো একজন সদস্যের ক্যান্সার হলে পুরো পরিবারের ওপর এর প্রভাব পড়ে। উচ্চবিত্তদের তা খুব একটা কাবু করতে না পারলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সর্বসান্ত করে ছাড়ে। একদিকে প্রিয়জনের যন্ত্রণা দেখে মানসিক কষ্ট, আরেক দিকে তার ব্যয়বহুল চিকিৎসা সামলাতে অার্থিক টানাপোড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যান্সারাক্রান্তের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কেবল মানসিক প্রশান্তির জন্য পরিবারগুলো তার ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যায়৷

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত বছর দেড় লাখেরও বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এবং এদের বেশির ভাগই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

সম্প্রতি বিবিসির তৈরি একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ৩০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের রোগী। বাকি যা আছেন, প্রায় সকলেই মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। উচ্চবিত্তরা সাধারণত দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।

বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে ক্যান্সারাক্রান্তদের অনেকেই বলেছেন, চিকিৎসা-ব্যয় নির্বাহে তাঁদের পরিবারগুলো একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

একদিকে চিকিৎসা-সেবার ব্যয়বহুলতা, অন্যদিকে সেবাগ্রহণে নির্মম পর্যায়ের ভোগান্তি। ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ক্যান্সারাক্রান্ত এক নারী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন তাঁর ভোগান্তির কথা। বলেছিলেন, ‘আমি ঢাকার বাইরে থেকে আসি। কিন্তু এখানে সময়মতো সিরিয়াল পাই না। আসলে বলে ১০দিন পরে আসেন। আবার কয়েকদিন পর আসতে বলে। আমি সময়মতো চিকিৎসা পাই না। টাকাও অনেক খরচ হয়। সেটা যোগাড় করাও আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের সমস্যা, খুব সমস্যা।’

জামালপুরের মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন গৃহিণী ইসমত আরা নাজমা। নয় বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর প্রথম পর্যায়ে অপারেশন করতেই পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। এরপর ধাপে ধাপে চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে।

আক্রান্ত হওয়ার দুই বছরের মাথায় তাঁর স্বামী স্ট্রোক করে মারা যান। তখন স্কুলশিক্ষার্থী দুই ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা এবং অন্যদিকে নিজের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সামলাতে গিয়ে বেশ কষ্ট হয় মধ্যবিত্ত পরিবারের ইসমত আরা নাজমার।

চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘তখন আমার স্বামী ছিলেন। চাকরি করতেন। দুইটা ছেলে মেয়ে লেখা-পড়ার মধ্যে ছিল। ঐ সময় ক্যান্সার ধরা পড়লো। তারপরে অপারেশন হওয়ার পরে তো আমার স্বামী নিজেই স্ট্রোক করে মারা গেলেন। শুধু আমার জন্য টেনশন করে উনি মারা গেলেন। কিন্তু বাঁচার জন্য চিকিৎসা তো করাতেই হবে। কী করব আর!

‘চেক আপ করাতে যাই। অনেক টেস্ট দেয়, তাতে অনেক টাকা লাগে। মাঝখানে একটা টেস্ট দিয়েছিলো, তাতে ৬৫ হাজার টাকা লাগে। এত টাকা লাগে, আমার জন্য জুলুম হয়ে যায়। ধরেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার আব্বা বেঁচে ছিলেন। তিনি এবং আমার ভাইরা সাহায্য করেছেন। কত আর তাদের কাছ থেকে নেই। অপারগ হয়ে অল্পকিছু জমিজমা ছিল, সেগুলো বেচতে শুরু করেছি।’

পুরোপুরি ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় হরমোন থেরাপি থেকে শুরু করে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি এবং অনেক ঔষধের প্রয়োজন হয়। এর প্রতিটি ধাপেই গুনতে হয় বড় অংকের অর্থ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে উল্লেখ করেন, চিকিৎসা ব্যয় পরিবারগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, যেমন অর্থনৈতিকভাবে, তেমন মানসিকভাবেও।

তিনি বলেন, ‘একটা ক্যান্সার ইনস্টিটিউট আছে। কেউ কেউ ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরেও যান। কিন্তু সেটা দিয়ে কি আমরা বলতে পারি, জাতীয়ভাবে আমরা সমর্থ, মোটেও না।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘প্রতিবছর অনেক মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য দরিদ্র সীমার নিচে নেমে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেক মানুষই ধারণা না থাকায়, এই সেবা নিতে গিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন, নিজে মারা যাচ্ছেন, তার পরিবারকেও মেরে রেখে যাচ্ছেন। এই নিষ্ঠুর সত্যটা আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না বুঝবো, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্যান্সার শব্দটা নিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হতেই থাকবে।’

ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় একটি মাত্র বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। ঢাকার বাইরে মাত্র দু’টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সীমিত আকারে চিকিৎসা দেয়া হয়।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলেন, ‘এই রোগের চিকিৎসা সেবা মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক। যা করছি আমরা ঢাকায় করছি। কিন্তু ১ লাখ ৫০ হাজার রোগী যদি নতুন করে আক্রান্ত হয়, এর যদি তিন ভাগের একভাগ রোগীও ডায়াগনসিস হয়, তাহলে যে ক’টা হাসপাতাল আছে, তাতে ৫০ হাজার রোগীর চিকিৎসা ঢাকা শহর কি করে দেবে?

‘দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। কেমোথেরাপি দিতে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস এবং রেডিও থেরাপির সিরিয়াল পেতে চার পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। অপারেশনেই এরকম সময় লাগছে। ফলে ঢাকার বাইরে অন্তত বিভাগীয় শহরে এই চিকিৎসা গড়ে তুলতে না পারলে মানুষের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের কারণে বিশেষায়িত হাসপাতাল সেভাবে গড়ে উঠছে না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোনো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হয় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবেরা খাতুন নারীদের ক্যান্সার নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘একটি হাসপাতালেও ক্যান্সারের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও করা যায়নি। ফলে রোগীকে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে হাসপাতাল পাল্টাতে হয়।

‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। শুধু বিশেষজ্ঞ হলেই তো হবে না। হাসপাতালে সুবিধা দরকার। সরকারি পর্যায়ে হাসপাতালে সে রকম সুবিধা আছে। কেমোথেরাপিটা ভালই হচ্ছে। কিন্তু রেডিওথেরাপির ব্যাপারে ভীষণ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। যেখানে ১২৬টা রেডিও থেরাপি সেন্টার থাকার কথা, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটা আছে। আট-দশটাও হবে না।’


আপনার মতামত লিখুন :
আরো পড়ুন
শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ কাটার সময় ধরা খেল ৪ কর্মী

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ কাটার সময় ধরা খেল ৪ কর্মী

অ্যারাবিয়ার একটি বিমান থেকে লাগেজ কেটে মালামাল চুরির সময় চারজনকে…

শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতনের সাজা মৃত্যুদণ্ড করতে যাচ্ছে ভারত

শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতনের সাজা মৃত্যুদণ্ড করতে যাচ্ছে ভারত

শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয়…

সেনা কবরস্থানে এরশাদের দাফন আগামীকাল

সেনা কবরস্থানে এরশাদের দাফন আগামীকাল

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদের জানাজা…

আগের তুলনায় সীমান্তে হত্যা অনেকটা কমেছে
আগের তুলনায় সীমান্তে হত্যা অনেকটা কমেছে

আগের তুলনায় সীমান্তে হত্যা অনেকটা কমেছে

আগের তুলনায় সীমান্তে হত্যা অনেকটা কমে এসেছে বলে দাবি করেছেন…

ধর্ষণ রুখতে কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ধর্ষণ রুখতে কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের…

টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য সুরমা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ কিশোর, ৪৮ ঘন্টা পর মিলল লাশ

টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য সুরমা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ কিশোর, ৪৮ ঘন্টা পর মিলল লাশ

সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া জনপ্রিয় গান ‘তরে ভুলে যাওয়ার লাগি…

সিলেট দিন দুপুরে ছিনতাই গোলাপগঞ্জে টাকাসহ আটক ৩

সিলেট দিন দুপুরে ছিনতাই গোলাপগঞ্জে টাকাসহ আটক ৩

সিলেটের শাহপরাণ থেকে টাকা ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধাওয়া…

‘পদ্মা সেতুর জন্য মাথা লাগবে’ গুজবে আটক ১

‘পদ্মা সেতুর জন্য মাথা লাগবে’ গুজবে আটক ১

ছেলে ধরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও ম্যাসেঞ্জারের…