রাগিব রব্বানি

প্রকাশিত:
১২ জুন, ২০১৯ ০২:২৪ পিএম


হস্তলিপি থেকে কম্পিউটার কম্পোজ

বদলে যাচ্ছে কওমি মাদরাসার পাঠ্যপুস্তকের মান ও ধরণ


বদলে যাচ্ছে কওমি মাদরাসার পাঠ্যপুস্তকের মান ও ধরণ

কওমি মাদরাসার সিলেবাসভুক্ত আরবি-উর্দু-ফারসি কিতাবগুলো অদ্ভুত এক ফন্টে লেখা। ডিজিটাল এই যুগের অনেকেই হয়তো কিতাবগুলোর লিপি দেখে হতবাক হবেন, বলবেন, এ কেমন ফন্ট! তবে নিকট অতীতের ছাপাশিল্প সম্পর্কে যাঁদের খানিক ধারণা আছে, তাঁরা সহজে অনুমান করে নিতে পারবেন, এ লেখা কম্পিউটারে টাইপ করা কোনো ফন্ট নয়, এটা হস্তলিপিতে লিখিত। কম্পিউটার-কম্পোজকৃত আরবি পড়ে যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁদেরকে এই লিপিতে লিখিত কিতাবগুলোর এবারত পড়তে বেশ বেগ পেতে হবে। বিশেষ করে হাশিয়া ও বাইনাস সুতুর (টীকা ও উপটীকা) তো একদম পড়তেই পারবেন না। এটা আরবি লেখা কি-না, সে-নিয়েই বরং সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। তবে কওমি মাদরাসার ছাত্র-উসতাদ অভ্যস্ততার কারণে অনর্গল এবং আশ্চর্যরকম দ্রুততার সঙ্গে পড়ে যেতে পারেন এসব কিতাবের এবারত।

ছোট ছোট কিতাবগুলোর কম্পোজ-সংস্করণ বেশ কিছুকাল আগে বাজারে এলেও মাঝারি ও বড় সাইজের কিতাবগুলো সেই হস্তলিপি ভার্সনেই পুনর্মুদ্রিত হয়ে আসছিল যুগ যুগ ধরে। একসময় বাংলাদেশের কোনো লাইব্রেরি এই কিতাবগুলো ছাপত না, ভারতের দেওবন্দের কয়েকটি প্রকাশনী থেকে আমদানি করা হতো যাবতীয় কিতাব। কালের পরিক্রমায় দেওবন্দের সেই হস্তলিপিতে ছাপা নুসখাগুলো কপি করে বাংলাদেশের কিছু প্রকাশনীও সংস্করণ বের করে। তবে সংস্করণের লিপি হস্তলিপিই থেকে যায়। ব্যতিক্রমের মধ্যে কেবল কিতাবগুলোর শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ দু’একটা ভূমিকা কম্পিউটার ফন্টে লিখে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। আদতে খুব কোনো পরিবর্তন ছিল না। ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো অভিন্নই থেকে যেত।

অনেকদিন আগের রেডিমেট হস্তলিপি ছেড়ে বড় বড় এ কিতাবগুলোর কম্পিউটার কম্পোজ-সংস্করণ বের করা অনেকটা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, কিতাবগুলোতে এত পরিমাণ টীকা ও উপটীকা (হাশিয়া/বাইনাস সুতুর) সংযুক্ত, কম্পিউটার-কম্পোজে সেগুলোকে বিন্যস্ত করা অনেক ঝামেলাপূর্ণ ছিল।

কিন্তু বিগত তিন/চার বছর ধরে বাংলাদেশের নতুন কয়েকটি প্রকাশনী তুমুল ঝামেলাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং এই কাজটি আশ্চর্যরকম সফলতার সঙ্গে আঞ্জাম দেওয়া শুরু করেছে। মাকতাবাতুস সালাম, মাকতাবাতুল ইসলামসহ বেশ কয়েকটি প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠানের চেষ্টায় ইতিমধ্যে হাদিসের শ্রেষ্ঠ ছয় কিতাব (সিহাহ সিত্তাহ)-সহ মেশকাত, হেদায়া, জালালাইন, মুখতাসারুল মাআনির মতো বড় বড় কিতাব তাঁরা কম্পিউটার-ফন্টে সুন্দর ও চমৎকার বিন্যাসে বাজারে নিয়ে এসেছে। কয়েকটা প্রকাশনী একসঙ্গে কাজ করায় এক্ষেত্রে একটা প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে পরস্পরের মধ্যে, যারফলে কম্পোজ, ছাপা, বিন্যাস, বাইন্ডিং—সবকিছুতে একটা মানসম্পন্নতা বজায় থাকছে।

হস্তলিপির সংস্করণগুলোতে বাইনাস সুতুরের (উপটীকা) সঙ্গে মূল এবারত একাকার হয়ে যেত, হাশিয়াগুলোও থাকত একদম অবিন্যস্ত ও অস্পষ্টভাবে। তাছাড়া শিরোনাম, উপশিরোনাম, অনুশিরোনাম সবকিছু ধারাবাহিকভাবে এবারতের লাইনে লাইনে থাকত, জায়গা বাঁচানোর জন্য এভাবে আরও নানা কিসিমের কায়দা ফলানো হতো হস্তলিপির সংস্করণগুলোতে। কম্পিউটার কম্পোজকৃত নতুন সংস্করণগুলোতে এইসব ঝামেলা থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে ছাত্রদেরকে। প্রতিটা শব্দ ও বাক্যে যথাযথ যতি চিহ্ন ব্যবহার, টীকা উপটীকাগুলোকে স্পষ্ট ও বিন্যস্তভাবে আনয়নের পাশাপাশি একাধিক কালারে মুদ্রিত নতুন এ সংস্করণগুলো শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন ও মুতালাআকে স্বস্তি ও আরামদায়ক করে দিয়েছে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসার মেশকাত জামাতের কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নতুন এসব সংস্করণ নিয়ে তাদের অনুভূতির কথা। তাঁরা জানান, দরসি কিতাবের কম্পিউটার কম্পোজ সংস্করণ ছাত্রদের মধ্যে একধরনের প্রফুল্লতা এনে দিয়েছে। লেখার অস্পষ্টতা কিংবা হিজিবিজি ভাবের কারণে এখন আর তাদেরকে বিরক্ত হতে হয় না।

রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসায় সদ্য বিগত শিক্ষাবর্ষে মেশকাত পড়েছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, মেশকাত শরিফ ও হেদায়া কিতাবের নতুন সংস্করণ কিনেছিলেন তিনি, কিতাবগুলোর ছাপা ও বিন্যাস বিশ্বমানের লেগেছে তাঁর কাছে। মুতালাআ করতেও স্বস্তি বোধ করেছেন সারা বছর।

তবে বড় মাদরাসাগুলোর কোনো কোনো উসতাদ এখনও হস্তলিপির নুসখার প্রতি ছাত্রদের উৎসাহিত করেন। হস্তলিখিত নুসখাগুলোতে আকাবের বুজুর্গদের একটা ছোঁয়া আছে বলে এতে আলাদা একটা বরকত পাবার আশাবাদ থাকে তাঁদের মধ্যে।

তবে রাজধানীর বাইরে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলের মাদরাসায় উপরের জামাতগুলোতে বড় বড় কিতাব কেনার প্রচলন না থাকায় সেসব মাদরাসার ছাত্ররা হস্তলিপির বদলে নতুন এসব সংস্করণ যে বেরিয়েছে তার খবরই জানেন না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই মাদরাসাগুলোতে মাদরাসার কুতুবখানা বিভাগ থেকে এক বছরের জন্য ছাত্রদেরকে নামমাত্র ফির বিনিময়ে গণহারে কিতাব প্রদান করা হয়। যার দরুণ ওইসব মাদরাসার ছাত্ররা, ধনী হোক কিংবা গরিব, কিতাব কেনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। মাদরাসার পুরনো কিতাব দিয়েই যুগ যুগ ধরে পড়াশোনা করে আসছেন ছাত্ররা। ফলে কিতাবের প্রতি রাজধানীর ছাত্রদের আলাদা যে আগ্রহ ও যত্ন পরিলক্ষিত হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রদের মধ্যে সেটা খুব একটা পাওয়া যায় না।

সিলেট, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর এমন একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তাঁরা বড় বড় কিতাবগুলোর নতুন সংস্করণের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। জানার তেমন আগ্রহও পরিলক্ষিত হয়নি তাঁদের মধ্যে।


আপনার মতামত লিখুন :
শিক্ষা এর আরও খবর

আরো পড়ুন
খুঁজে পাওয়া ছোটবেলার বন্ধু

খুঁজে পাওয়া ছোটবেলার বন্ধু

সালাতুর রহমান মাহবুব, ছোটবেলার কয়েক বন্ধুদের মধ্যে একজন ক্লাসমেট ও…

কলরব দ্বিখন্ডের আসল নায়ক বদরু!

কলরব দ্বিখন্ডের আসল নায়ক বদরু!

বাংলাদেশে ইসলামি সংগীত জগতের তারকাপুরুষ প্রয়াত আইনুদ্দীন আল আজাদ। জীবনের…

বাহুবলে উপজেলা প্রশাসন’র উদ্যোগে ১২ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

বাহুবলে উপজেলা প্রশাসন’র উদ্যোগে ১২ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায় ছোট বড় ১২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন…

১ মাস ধরে আবুধাবির মর্গে পড়ে আছে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার লাশ
দূতাবাসের নেই কোনো উদ্যোগ, বৃদ্ধা মায়ের আহাজারি

১ মাস ধরে আবুধাবির মর্গে পড়ে আছে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার লাশ

সংযক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গত ২৫ জুলাই থেকে মর্গে পড়ে…

আহমেদ জুয়েলকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা

আহমেদ জুয়েলকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা

আহমেদ জুয়েল তরুণ লেখকদের মধ্যে অনেক জনপ্রিয় নাম। নিজের মধ্যে…

সহকারী কমিশনারের ড্রয়ার ভেঙে ইয়াবা চুরি, কনস্টেবল কারাগারে

সহকারী কমিশনারের ড্রয়ার ভেঙে ইয়াবা চুরি, কনস্টেবল কারাগারে

ঢাকার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন সহকারী কমিশনারের (এসি) অফিসের ড্রয়ারের…

জামালপুরের সেই ডিসির আরেক ভিডিও ভাইরাল

জামালপুরের সেই ডিসির আরেক ভিডিও ভাইরাল

জামালপুরের ওএসডি হওয়া ডিসি আহমেদ কবীরের গান গাওয়ার একটি ভিডিও…

দুর্নীতির অভিযোগে তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

দুর্নীতির অভিযোগে তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

দুর্নীতির অভিযোগে বিচারকাজ থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে…