হামমাদ রাগিব
অতিথি লেখক
প্রকাশিত:
২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৬:০৩ পিএম
আপডেট:
২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৬:০৬ পিএম


বাদশাহ ফয়সাল : সৌদি আরবের সৎ ও স্মরণীয় শাসক


বাদশাহ ফয়সাল : সৌদি আরবের সৎ ও স্মরণীয় শাসক

১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৪ বছরের কিশোর-বয়েসে বাবার রাজনৈতিক প্রতিনিধি হয়ে ইউরোপ সফর করেছিলেন তিনি। এবং সৌদি রাজপরিবারের কোনো সদস্যের এটাই ছিল প্রথম ইউরোপ সফর। ইউরোপের রাজ-রাজড়া ও কূটনীতিকদের সঙ্গে অকুণ্ঠভাবে আলাপ সেরেছেন সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষ থেকে। বয়েসের অপরিপক্কতা তাঁকে এতটুকু কুণ্ঠিত করতে পারেনি।

এই সাহস ও দক্ষতা ধীরে ধীরে তাঁকে বিকশিত করে একটা সময় সৌদি আরবের সিংহাসনে সমাসীন করে। তিনি বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ তাঁর সৎ ভাইয়ের ছেলে ফয়সাল বিন মুসাইদের ছোড়া গুলিতে তিনি নিহত হন।

বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ যদিও রাজতন্ত্রের শাসক ছিলেন, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ঐক্যপ্রচেষ্টা, উন্নতি ও ইসরায়েল-বিরোধিতায় অবদানের জন্য তিনি যেমন মুসলিম বিশ্বের কাছে প্রশংসিত ও শ্রদ্ধার পাত্র, তেম্নি সেকেলে সৌদি রেওয়াজ ও নানামাত্রিক কুসংস্কার দূর করে উন্নত দেশ গড়ার প্রচেষ্টার কারণে সৌদি সমাজেও বরিত হয়ে আছেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়েসে হাইল ও আসিরের দুটো যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফয়সাল। তাঁর বাবা সৌদি আরবের প্রথম বাদশাহ আবদুল আজিজ আলে সৌদ। বাদশাহ আবদুল আজিজ ছেলের দক্ষতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে হেজাজের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের বয়েস তখন মাত্র ২০। তারপর ২৪ বছর বয়েসে বাবা তাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

বাবার মৃত্যুর পর সৌদি আরবের বাদশাহি পান বড়ভাই সৌদ বিন আবদুল আজিজ। এদিকে ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ তাঁর কর্মতৎপরতা এবং ধর্মের প্রতি ঝোঁকের কারণে ইতিমধ্যে সৌদি ওলামায়ে কেরাম ও সুশীল শ্রেণীর প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। বাদশাহ সৌদ ক্ষমতাগ্রহণের পর তাঁরা বাদশাহকে চাপ প্রয়োগ করেন ফয়সালকে যেন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়। সৌদ বিন আবদুল আজিজ চাপের মুখে তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দিতে বাধ্য হন। কিন্তু দু’ভাইয়ের মধ্যে তখন থেকেই একটা দ্বন্দ্ব ও দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রচেষ্টা এবং ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অবৈধ দখলদারির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি দেশের উন্নয়নেও শুরু করেন পরিবর্তনকামী নানা উদ্যোগ।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৬২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ তাঁরই প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হাজার বছর ধরে চলে আসা দাসপ্রথার বিলুপ্তিও তাঁর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। ১৯৬২ সালে রাজকীয় ফরমান জারি করে সৌদি আরবে এ প্রথা নিষিদ্ধ করেন। এ সময় জনপ্রতি ২ হাজার মার্কিন ডলারের সরকারি ব্যয়ে প্রায় ১৬৮২ জন দাস মুক্তি লাভ করে।

১৯৬৩ সালে ফয়সল সৌদি আরবে টেলিভিশন স্টেশন স্থাপন করেন। এ সময় সৌদি ওলামায়ে কেরাম প্রচণ্ডভাবে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। কিন্তু বাদশাহ ফয়সল নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে আলেমদেরকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, ইসলামের মাপকাঠি মেনে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হবে এবং ইসলামের কল্যাণেই তা ব্যবহার করা হবে। তারপরও একটা ক্ষোভ থেকে যায় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজের কাজ, কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ফয়সল এ ক্ষোভ দূর করে নেন।

১৯৬৪ সালে বাদশাহ সৌদ বিন আবদুল আজিজ চিকিৎসার জন্য বিদেশ গেলে ফয়সল কেন্দ্রীয় ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ন্যাশনাল গার্ডকেও নিয়ে আসেন নিজের আনুগত্যে। কিছুদিন পর বাদশাহ সৌদ দেশে ফিরলে ন্যাশনাল গার্ডের সাহায্যে তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। এদিকে ফয়সলের দক্ষতা ও কর্মগুণের কারণে রাজপরিবার ও ওলামায়ে কেরামও তাঁকে সমর্থন জানান। বড়ভাই সৌদ বাদশাহি ছাড়তে তখন বাধ্য হন। ফয়সল বিন আবদুল আজিজ হয়ে যান নতুন বাদশাহ। ১৯৬৪ সালের ২ নভেম্বর তাঁকে বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয় আর ক্ষমতাচ্যুত বাদশাহ সৌদকে গ্রিসে পাঠানো হয় নির্বাসনে।

ক্ষমতাগ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বাদশাহ ফয়সল বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের ভাই এবং সেবক। আমাকে সেভাবেই আপনারা দেখবেন। আমি ঘোষণা করছি, মহিমা (ম্যাজিস্ট্রি) শুধু আল্লাহর, আর মুকুট হলো আসমান ও জমিনের মুকুট।’

নতুন বাদশাহি পাবার পর সৌদির অর্থনৈতিক সংস্কারে তিনি মনোনিবেশ করেন। ওহাবি আলেমদের অসমর্থন সত্ত্বেও অওহাবিদেরকেও তিনি কাছে টানেন এবং সুযোগ-সুবিধা দেন। সৌদি রাজপুতদের বিদেশে পড়াশোনার পরিবর্তে দেশেই উচ্চশিক্ষাগ্রহণের ফরমান জারি করেন এবং দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক কারিকুলামে গড়ে তোলেন। ফলে দেশীয় শিক্ষার প্রতি উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও আগ্রহী হয়ে ওঠে।

তাঁর শাসনামলে খুব দ্রুতই তেল উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বতেলবাজারে প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরবের নাম উঠে আসে।

১৯৬৯ সালে ইহুদিবাদী ইসরায়েল মসজিদুল আকসায় হামলা করলে এর পরিপ্রক্ষিতে এক মাস পর চলতি বছরের সেপ্টেমরে মরক্কোর রাবাতে তিনি মুসলিম দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৫টি মুসলিম রাষ্ট্র এতে অংশগ্রহণ করে। এবং এ সম্মেলনেই গঠিত হয় অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)।

১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের নির্লজ্জ সমর্থন বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেন বাদশাহ ফয়সল। এতে তেলের দাম বহুগুণে বেড়ে যায়। দামবৃদ্ধি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা তিনি সেই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ মিশর, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে সহায়তায় ব্যয় করেন।

বাদশাহ ফয়সাল তাঁর এই কাজের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের চক্ষুশূলে পরিণত হন। এর পর আর বছর দুয়েকও তাঁর বাঁচার সুযোগ হয়নি, ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতি অবলম্বন করে তাঁকে হত্যা করা হয়। হত্যাকারী তাঁরই ভাতিজা এবং তাঁর নামেই নাম—ফয়সল বিন মুসাইদ। কিছুদিন আগে সে আমেরিকা থেকে ফিরেছিল। ফিরেছিল হত্যার যাবতীয় কৌশল ও পরিকল্পনা রপ্ত করে। এবং সেটা সম্পূর্ণ আমেরিকার মদদেই।

সেদিন রাজপ্রাসাদে সৌদি নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন বাদশাহ ফয়সল। এমন সময় ফয়সল বিন মুসাইদ আকস্মিকভাবে পরপর দুটো গুলি করে তাঁকে। প্রথমটি তাঁর চিবুকে লাগে আর দ্বিতীয়টি কান বিদীর্ণ করে বেরিয়ে যায়। একজন রক্ষী তলোয়ার বের করে তৎক্ষণাৎ হামলাকারীকে ধরাশায়ী করে। আর বাদশাহকে নিয়ে যাওয়া হয় হসপিটালে। কিন্তু অল্পসময়ের ভেতরই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। ইন্তেকাল করেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যপ্রত্যাশী একজন আরব শাসক। পরবর্তী আরববিশ্ব অমন শাসক আজ অবধি আর পায়নি।

লেখক ঃ সহকারী সম্পাদক, মাসিক নবধ্বনি 


আপনার মতামত লিখুন :
আরো পড়ুন
মদিনা মার্কেটের কেয়ারটেকার আলীর কাছে মার্কেট ব্যবসায়ীরা জিম্মি

মদিনা মার্কেটের কেয়ারটেকার আলীর কাছে মার্কেট ব্যবসায়ীরা জিম্মি

সিলেট জেলার জালালাবাদ থানা দিন টুকুর বাজার ইউনিয়নের কুমারগাঁও এলাকার…

বাহুবলের ছাত্রী বৃষ্টিকে নিয়ে গর্বিত গৃহ শিক্ষক মামুন

বাহুবলের ছাত্রী বৃষ্টিকে নিয়ে গর্বিত গৃহ শিক্ষক মামুন

২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমি যখন সৃজন জুনিয়র…

মদিনা মার্কেট মালিক ম্যানশনের কেয়ারটেকার আলীর আসল মুখোশ

মদিনা মার্কেট মালিক ম্যানশনের কেয়ারটেকার আলীর আসল মুখোশ

সিলেট জেলার জালালাবাদ থানা দিন টুকের বাজার ইউনিয়নের কুমারগাঁও এলাকার…

বাহুবলে প্রভাবশালী জিলুলের ছেলেরা কুটিকে জমিনে কুপিয়ে আহত

বাহুবলে প্রভাবশালী জিলুলের ছেলেরা কুটিকে জমিনে কুপিয়ে আহত

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার শংকরপুর গ্রামের বহু অপকর্মের হুতা জিলু…

বাহুবলে কাজের সমাপ্তির এক সপ্তাহের মধ্যে উঠে যাচ্ছে পিচঢালা,অনিয়মের জন্য দায়ী কে?

বাহুবলে কাজের সমাপ্তির এক সপ্তাহের মধ্যে উঠে যাচ্ছে পিচঢালা,অনিয়মের জন্য দায়ী কে?

হবিগঞ্জের বাহুবলে পাকা রাস্তার কাজ সমাপ্তির এক সপ্তাহ মধ্যেই পাকা…

বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের জন্য ভিসা বন্ধ

বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের জন্য ভিসা বন্ধ

দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবার পাকিস্তানিদের…

আমান গ্রুপের ২ কর্মকর্তা আটক, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

আমান গ্রুপের ২ কর্মকর্তা আটক, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

মেঘনা নদী ভরাট করে গড়ে তোলা আব্দুল আমান গ্রুপের অবৈধ…

ফ্রান্সে সার্সেল বোমা বিস্ফোরণে শিশুসহ আহত ১৩

ফ্রান্সে সার্সেল বোমা বিস্ফোরণে শিশুসহ আহত ১৩

ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিয়নের একটি ব্যস্ততম সড়কে…