নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত:
০১ এপ্রিল, ২০১৯ ০৩:০৭ এএম


ইউরোপ সে আগের ইউরোপ নয়


ইউরোপ সে আগের ইউরোপ নয়

১৯৭৯ সালে প্রথম ফ্রান্সে আসি৷ তখন ভারতে খালিস্তান আন্দোলনের ফলে শিখ ধর্মালম্বীরা  ইউরোপ এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে শুরু করেছেন৷ পরে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধের সময় তামিলরা আসতে শুরু করেন৷ তখনো পর্যন্ত যেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগটাই বেশি ছিল৷

আজ যদি বলি যে, রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির তাড়নাই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, তাহলে স্বভাবতই অনেকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা সোমালিয়ার মতো দেশের দৃষ্টান্ত দেবেন – এবং তাতে ভুলেরও কিছু নেই৷ ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যেতে পারে: রাজনীতির বিপত্তি এড়াতে মানুষ যখন অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবে, তখন সেই ভিনদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনেতিক সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা, সে কথাটাও তারা ভেবে দেখে বৈকি৷

উদ্বাস্তু সংকট, অভিবাসন, দেশ ছাড়া, এ সবের পিছনে হাজারটা মানবিক কাহিনি, সহস্র মানবিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে রয়েছে৷ আর রয়েছে মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি: নিজের এবং নিজের পরিবারের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর প্রচেষ্টা৷ ইউরোপের সব দেশই ভিয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী, ইউরোপের সব দেশেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা যায়৷ তবুও জার্মানি কিংবা সুইডেনে যেতে পারা একটা আলাদা ব্যাপার৷

ইউরোপ চলো!

‘পলিটিক্যাল করেক্টনেস' মাথায় রেখে যদি ভাই-বেরাদারদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, তাহলে বলতে হয় যে, ইউরোপে আসব বললেই তো আর ইউরোপে আসা যায় না৷ অমুক ভাই বাড়িঘর, জমিজেরাত বেচে, কোন এক দালালকে টাকা দিয়ে, তুর্কি হয়ে, রাবারের ডিঙিতে সাগর পেরিয়ে গ্রিসের লেসবসে  অথবা মরক্কোতে পৌঁছে – সেখানেই ফেঁসে গেছেন – বা গিয়েছিলেন৷ এবার নাকি তাকে ডাঙার রাস্তা ধরে উত্তরে নিয়ে যাচ্ছে আরেক সম্বন্ধি, তিনিও কিছু কম নেন না৷

তমুক ভাই তো গ্রিসের পথ না ধরে, মিশর হয়ে লিবিয়া গিয়ে, সেখান থেকে ইটালিতে পৌঁছেছেন৷ সেখানকার ভাইরা জার্মানের বা ফ্রান্সের খবর জানেন – তারা বলছেন, এহানেই থাইক্যা যান৷ জার্মানি বা ফ্রান্স তো আর আগেরসে জার্মানি,ফ্রান্স নাই, ইউরোপও আর সে ইউরোপ নাই৷ যেখানে কাজকর্ম আছে, মাথা গোঁজার জায়গা আছে, সেখানে যাহোক করে দিন কাটিয়ে দেন৷ দেখবেন ইটালিতে আমাগো দ্যাশের লোক আফ্রিকার মানুষজনের চেয়ে বেশি কদর পায়, তাড়াতাড়ি কাম পায়, কি দোকানপাট কিছু একটা খুলে বসে৷ এ দেশে আইন কিছুটা ঢিলেঢালা৷ জার্মানি,ফ্রান্স অ্যাসাইলামদের দেয় বেশি, তবে নজরও রাখে বেশি৷ আর শুনেছেন তো, অদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি এবার সেন্টার খুইল্যা সেখানে ডিপোর্টেশনের কেসগুলিকে রাখব৷ কাগজ না থাকলে নাকি যে দেশের লোক, সে দেশের কাছে কাগজ তলব করব, কাগজ না দিলে উন্নয়ন সাহায্য কমাইয়া দিব৷

এ সব কিছুর খানিকটা শোনা, খানিকটা জানা, বাকিটা কল্পনা – কিন্তু পুরোটাই কেমন যেন সত্য৷ উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসীদের চেয়ে বাস্তববাদী আর কেউ নেই৷ দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতেই যেখানে বুকের পাটা লাগে, সেখানে রবাহুত, অনাহুত হিসেবে বিদেশে যাওয়া, ভিসা ছাড়া পরের দেশে ঢোকা, ধৈর্য্যে বুক বেঁধে সুদিনের অপেক্ষা করার জন্য কতোটা বুকের পাটা লাগে, একবার ভেবে দেখুন৷

স্বর্গ হতে বিদায়

তাই আমার এই সাহসী ভাইদের আমি শুধু বিচার করে দেখতে বলব: ইউরোপে হাওয়া যে বদলাচ্ছে, খোদ ইউরোপ যে বদলাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ ব্রেক্সিট, গোটা ইউরোপ জুড়ে দক্ষিণপন্থি, জাতীয়তাবাদী পপুলিস্টদের পালে হাওয়া, এ সব ভালো লক্ষণ নয় – কিন্তু স্বাভাবিক, যেমন জোয়ারের পর ভাটা৷ আমার মন বলছে, ইউরোপ এবার ঘরে আগল দেবে; ইউরোপ আর আগের মতো বিদেশি-বহিরাগতদের সাদরে, সস্নেহে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করবে, ইউরোপের মনে যেন কোথায় শঙ্কা ঢুকে গেছে৷

বদান্যতা কোনো মানুষ কিংবা জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, তা আসে অবস্থা ও পরিস্থিতি থেকে৷ ঔপনিবেশিক ইউরোপের মতোই উদার ইউরোপ, দরাজ ইউরোপের দিন যেতে বসেছে৷ এ অবস্থায় যারা দেশঘর ছেড়ে এ মুলুকে আসবেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এককালে ইউরোপ আসাটা ছিল বুড়ি ছোঁয়ার মতো, একবার পৌঁছতে পারলেই নিশ্চিন্দি৷ এখন কিন্তু জার্মানিতে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি হলো ‘ব়্যুকফ্যুহরুং', যার অর্থ প্রত্যাবর্তন বা ফেরত পাঠানো৷

স্বর্গে আসা খুবই কষ্টের, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে আসতে হয়৷ তবে তার চেয়েও বেশি কষ্ট কীসে জানেন? স্বর্গ থেকে বিদায় নেওয়া৷ আল্লাহ করুন তা যেন কারো ভাগ্যে না জোটে৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷


আপনার মতামত লিখুন :
সৌদির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরব

সৌদির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ

রিয়াদের উপকণ্ঠে একটি ভবন খুব দ্রুত সৌদি আরবের পারমাণবিক শক্তির…

‘এটা সস্তা প্রশ্ন’ - তদন্তে রাজনীতির প্রভাব সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তা

‘এটা সস্তা প্রশ্ন’ - তদন্তে রাজনীতির প্রভাব সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তা

 পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায়ই মিথ্যা মামলায় হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে৷ যে…

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি বদলানো উচিত
শিক্ষা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি বদলানো উচিত

অনেক দিন ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বেশির…

সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জেনারেলদের গাঁটছড়া কেন?
পাকিস্তান

সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জেনারেলদের গাঁটছড়া কেন?

পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীরা ভারতে হামলা চালানোর পর আবারও পাকিস্তান ও ভারত…

ইনজেকশন কী সাংঘাতিক!

ইনজেকশন কী সাংঘাতিক!

সুইপার ইনজেকশন দেন রোগীকে। কী সাংঘাতিক! পত্রিকার পাতায় এ খবর…

বাদশাহ ফয়সাল : সৌদি আরবের সৎ ও স্মরণীয় শাসক

বাদশাহ ফয়সাল : সৌদি আরবের সৎ ও স্মরণীয় শাসক

১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৪ বছরের কিশোর-বয়েসে বাবার রাজনৈতিক প্রতিনিধি হয়ে…

নতুন নেতৃত্বের জন্ম
ডাকসু

নতুন নেতৃত্বের জন্ম

২৮ বছর পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র…

মেয়েরাও গায়ে পড়বেন না, প্লিজ!

মেয়েরাও গায়ে পড়বেন না, প্লিজ!

আমিও মেয়েদের বলতে চাই- আপু, গায়ে পড়বেন না প্লিজ। সরে…