বদরুল বিন আফরুজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত:
২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:৫৮ এএম


ইউরোপ তো বদলে যাচ্ছে!


গরিব দেশ থেকে যে সব মানুষ ধনি দেশে আসার চেষ্টা করেন, তারা মরিয়া৷ চরম হতাশার হাত থেকে তারা পালিয়ে বাঁচতে চান৷ কিন্তু যে স্বর্গে তারা পৌঁছাবেন বলে মনে করছেন, সেই স্বর্গ যদি ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৯৮০ সালে প্রথম ফ্রান্স আসেন৷ তখন ভারতে খালিস্তান আন্দোলনের ফলে শিখ ধর্মালম্বীরা ফ্রান্স ও জার্মানিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে শুরু করেছেন৷ পরে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধের সময় তামিলরা আসতে শুরু করেন৷ তখনো পর্যন্ত যেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগটাই বেশি ছিল৷

আজ যদি বলি যে, রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির তাড়নাই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, তাহলে স্বভাবতই অনেকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা সোমালিয়ার,কাশ্মীর মতো দেশের দৃষ্টান্ত দেবেন – এবং তাতে ভুলেরও কিছু নেই৷ ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যেতে পারে: রাজনীতির বিপত্তি এড়াতে মানুষ যখন অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবে, তখন সেই ভিনদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনেতিক সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা, সে কথাটাও তারা ভেবে দেখে বৈকি৷

উদ্বাস্তু সংকট, অভিবাসন, দেশ ছাড়া, এ সবের পিছনে হাজারটা মানবিক কাহিনি, সহস্র মানবিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে রয়েছে৷ আর রয়েছে মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি: নিজের এবং নিজের পরিবারের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর প্রচেষ্টা৷ ইউরোপের সব দেশই ভিয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী, ইউরোপের সব দেশেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা যায়৷ তবুও ফ্রান্সি,জার্মানি কিংবা সুইডেনে যেতে পারা একটা আলাদা ব্যাপার৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে তিন ধরনের সুরক্ষা৷

ইউরোপ চলো!
‘পলিটিক্যাল করেক্টনেস' মাথায় রেখে যদি ভাই-বেরাদারদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, তাহলে বলতে হয় যে, ইউরোপে আসব বললেই তো আর ইউরোপে আসা যায় না৷ অমুক ভাই বাড়িঘর, জমিজেরাত বেচে, কোন এক দালালকে টাকা দিয়ে, তুর্কি হয়ে, রাবারের ডিঙিতে সাগর পেরিয়ে গ্রিসের লেসবসে পৌঁছে – সেখানেই ফেঁসে গেছেন – বা গিয়েছিলেন৷ এবার নাকি তাকে ডাঙার রাস্তা ধরে উত্তরে নিয়ে যাচ্ছে আরেক সম্বন্ধি, তিনিও কিছু কম নেন না৷ তমুক ভাই তো গ্রিসের পথ না ধরে, মিশর হয়ে লিবিয়া গিয়ে, সেখান থেকে ইটালিতে পৌঁছেছেন৷ আরে অমুকের ছেলে দুবাই থেকে মরক্কো হয়ে সেই স্পেনে পৌঁছেছে ৷

সেখানকার ভাইরা ফ্রান্স ও জার্মানের খবর জানেন? – তারা বলছেন, এখক্নেই থাইক্যা যান৷ ফ্রান্স আর জার্মানি তো আর সে ফ্রান্স,জার্মানি নাই, ইউরোপও আর সে ইউরোপ নাই৷ যেখানে কাজকর্ম আছে, মাথা গোঁজার জায়গা আছে, সেখানে যাহোক করে দিন কাটিয়ে দেন৷ দেখবেন ইটালিতে অথবা ইস্পেন না হয় পর্তুগাল আমাগো দ্যাশের লোক আফ্রিকার মানুষজনের চেয়ে বেশি কদর পায়, তাড়াতাড়ি কাম পায়, কি দোকানপাট কিছু একটা খুলে বসে৷ এ দেশে আইন কিছুটা ঢিলেঢালা৷ ফ্রান্স ও জার্মানিতে অ্যাসাইলামদের দেয় বেশি, তবে নজরও রাখে বেশি৷ আর শুনেছেন জার্মানি তো, অদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি এবার সেন্টার খুইল্যা সেখানে ডিপোর্টেশনের কেসগুলিকে রাখব৷ কাগজ না থাকলে নাকি যে দেশের লোক, সে দেশের কাছে কাগজ তলব করব, কাগজ না দিলে উন্নয়ন সাহায্য কমাইয়া দিব৷

এ সব কিছুর খানিকটা শোনা, খানিকটা জানা, বাকিটা কল্পনা – কিন্তু পুরোটাই কেমন যেন সত্য৷ উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসীদের চেয়ে বাস্তববাদী আর কেউ নেই৷ দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতেই যেখানে বুকের পাটা লাগে, সেখানে রবাহুত, অনাহুত হিসেবে বিদেশে যাওয়া, ভিসা ছাড়া পরের দেশে ঢোকা, ধৈর্য্যে বুক বেঁধে সুদিনের অপেক্ষা করার জন্য কতোটা বুকের পাটা লাগে, একবার ভেবে দেখুন৷

স্বর্গ হতে বিদায়
তাই আমার এই সাহসী ভাইদের আমি শুধু বিচার করে দেখতে বলব: ইউরোপে হাওয়া যে বদলাচ্ছে, খোদ ইউরোপ যে বদলাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ ব্রেক্সিট, গোটা ইউরোপ জুড়ে দক্ষিণপন্থি, জাতীয়তাবাদী পপুলিস্টদের পালে হাওয়া, এ সব ভালো লক্ষণ নয় – কিন্তু স্বাভাবিক, যেমন জোয়ারের পর ভাটা৷ আমার মন বলছে, ইউরোপ এবার ঘরে আগল দেবে; ইউরোপ আর আগের মতো বিদেশি-বহিরাগতদের সাদরে, সস্নেহে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করবে, ইউরোপের মনে যেন কোথায় শঙ্কা ঢুকে গেছে৷

বদান্যতা কোনো মানুষ কিংবা জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, তা আসে অবস্থা ও পরিস্থিতি থেকে৷ ঔপনিবেশিক ইউরোপের মতোই উদার ইউরোপ, দরাজ ইউরোপের দিন যেতে বসেছে৷ এ অবস্থায় যারা দেশঘর ছেড়ে এ মুলুকে আসবেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এককালে ইউরোপ আসাটা ছিল বুড়ি ছোঁয়ার মতো, একবার পৌঁছতে পারলেই নিশ্চিন্দি৷ এখন কিন্তু জার্মানিতে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি হলো ‘ব়্যুকফ্যুহরুং', যার অর্থ প্রত্যাবর্তন বা ফেরত পাঠানো৷ফ্রান্সেও এমন আইন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর ইতালিতে তো কাগজ দিচ্ছে না।

স্বর্গে আসা খুবই কষ্টের, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে আসতে হয়৷ তবে তার চেয়েও বেশি কষ্ট কীসে জানেন? স্বর্গ থেকে বিদায় নেওয়া৷ আল্লাহ করুন তা যেন কারো ভাগ্যে না জোটে৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷


আপনার মতামত লিখুন :
বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর

আরো পড়ুন
তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় কৃত্রিম পা পেলো চবি শিক্ষার্থী রবি

তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় কৃত্রিম পা পেলো চবি শিক্ষার্থী রবি

২০১৮ সালের ৮ই আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেনে দুর্ঘটনাবশত দু'পা…

দিরাই থানার নিখোঁজ কিশোর মোঃ রুহিত আহমদের সন্ধান চায় পরিবার

দিরাই থানার নিখোঁজ কিশোর মোঃ রুহিত আহমদের সন্ধান চায় পরিবার

মোঃ রুহিত আহমদ ফয়জল নামে এক কিশোর হারিয়ে গেছে। তার…

দোয়ারাবাজারে জমি দখল করে সরকারী ঘর নির্মান করলেন আ লীগ নেতা

দোয়ারাবাজারে জমি দখল করে সরকারী ঘর নির্মান করলেন আ" লীগ নেতা

দোয়ারাবাজারে অন্যের জমি দখর করে প্রধান মন্ত্রীর আশ্রয়ণ- কর্মসুচীর আওতায়…

অবৈধ সম্পদের পাহাড় সেই ওসি প্রদীপের,অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে বাড়ি!

অবৈধ সম্পদের পাহাড় সেই ওসি প্রদীপের,অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে বাড়ি!

চাকরিজীবনের মাত্র ২৪ বছরেই টেকনাফের সমালোচিত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার…

সবার পাঠশালা রোপণ করল ৫ হাজার গাছ

সবার পাঠশালা রোপণ করল ৫ হাজার গাছ

করোনা দূর্যোগকালিন অবসরের সময়কে ভালো কাজের সাথে যুক্ত থেকে, করোনা…

দোয়ারাবাজারে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা

দোয়ারাবাজারে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে খাদেজা বেগম (২৭) নামে এক গৃহবধুর আত্মহত্যার খবর…

শেরপুর জেলা জবিয়ান ফোরামের যাত্রা শুরু

শেরপুর জেলা জবিয়ান ফোরামের যাত্রা শুরু

বাংলাদেশের অন্যতম বিদ্যাপিঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পুরান ঢাকার বুকে মাথা উচিয়ে…

করোনাভাইরাস: দেশে শনাক্তের সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়াল

করোনাভাইরাস: দেশে শনাক্তের সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়াল

দেশে করোনাভাইরাসে শনাক্তের সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়াল। এ পর্যন্ত ২…