হামমাদ রাগিব

প্রকাশিত:
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০৭:৩৮ পিএম


ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী: অনিবার্য অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি বাংলাদেশ


ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী: অনিবার্য অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি বাংলাদেশ

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ইস্যুতে অস্থির ভারত। এ আইনের প্রতিবাদে প্রায় পুরো ভারত জুড়েই চলছে বিক্ষোভ। লোকসভায় ক্ষমতাসীন দল বিজেপি নিজেদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে বিতর্কিত এ আইন পাশ করিয়ে নিয়েছে গত ১৩ ডিসেম্বর। তারপর রাজ্যসভায় তা পাশ করিয়ে নিতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। ভারতের নতুন এ নাগরিকত্ব আইন অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অনিবার্যভাবে ভয়াবহ ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল কী?

এ বিলের উদ্দেশ্য ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অবৈধ অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরকিত্ব দেবার জন্যই এই বিল। অন্যভাবে বললে, ভারতের প্রতিবেশী মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির অমুসলিম অভিবাসীদের সহজে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেবার জন্য এই বিলের অবতারণা। গত ১৩ ডিসেম্বর ভারতের লোকসভায় এ বিল পাশ করার মাধ্যমে আইনে পরিণত করা হয়েছে।

কী আছে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনে?

১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ১২ মাস টানা ভারতে থাকার নিয়মের সঙ্গে বিগত ১৪ বছরের মধ্যে ১১ বছর ভারতবাস জরুরি ছিল। এবারের সংশোধনীতে দ্বিতীয় অংশে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলি থেকে আনা নির্দিষ্ট ৬টি অমুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য ১১ বছর সময়কালটিকে নামিয়ে আনা হয়েছে ৬ বছরে।

১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ভারতে বসবাসকারী কোনও ব্যক্তি অথবা যাঁর বাবা-মা ভারতীয়, অথবা যিনি ভারতে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল জুড়ে বাস করে এসেছেন, তাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবার যোগ্য।

বেআইনি অভিবাসীরা ভারতের নাগরিক হতে পারে না। এই আইনের আওতায়, ১) যদি পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া কেউ দেশে প্রবেশ করে থাকেন অথবা ২) বৈধ নথি নিয়ে প্রবেশ করার পর নির্দিষ্ট সময়কালের বেশি এ দেশে বাস করে থাকেন, তাহলে তিনি বিদেশি অবৈধ অভিবাসী বলে গণ্য হবেন।

বিদেশি আইন ১৯৪৬ এবং পাসপোর্ট আইন, ১৯২০ মোতাবেক অবৈধ অভিবাসীকে জেলে পাঠানো বা প্রত্যর্পণ করা হয়ে থাকে।

২০১৫ ও ২০১৬ সালে সরকার ১৯৪৬ ও ১৯২০ সালের আইনানুসারে অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কিছু অমুসলিম গোষ্ঠীকে ছাড় দিয়েছে। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও তার আগে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ভারতে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিষ্টানদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অবৈধ অভিবাসীদের ওই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির সদস্যরা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে বাস করলেও তাঁদের জেলে বা নিজেদের দেশে পাঠানো হবে না। অর্থাৎ মুসলিম ব্যতীত অন্য সকল ধর্মের অবৈধ বাসিন্দারা নির্বিঘ্নে তাদের নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারবেন, কেবল মুসলিমদের জন্যই থাকবে সমস্যা। তারা ভারতে ১৯৫২ সালের আগে নিজেদের বা নিজেদের বাপ-দাদাদের বসবাস প্রমাণ করতে না পারলে তারা অবৈধ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন, এবং তাদের নতুনরূপে নাগরিকত্ব পাবার কোনো সুযোগ থাকবে না।

বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে পড়বে?

আসামে ইতিমধ্যেই এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও তোড়জোড় চলছে এ তালিকা প্রকাশের। অচিরেই সেখানে এনআরসি তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।

আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর সেখানকার ১৯ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। যাদের বেশির ভাগ বাঙালি। এদের মধ্যে মুসলিম আছেন ৬ লক্ষাধিক। নতুন নাগরিকত্ব আইনের কল্যাণে তালিকা থেকে বাদ পড়া অমুসলিমরা নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন, কিন্তু বাকি থাকবে এই ৬ লক্ষাধিক মুসলমান। যাদের অধিকাংশই বাঙালি।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হলে প্রায় এককোটি মুসলমান তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশংকা রয়েছে বলে জানিয়েছে সারা ভারত মতুয়া মহাসংঘ নামক একটি সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক মুসলিম এমন, যাঁরা রাজ্যের পুরানা বাসিন্দা এবং ভূমিপুত্র, কিন্তু তাঁদের কোনো কাগজপত্র নেই। এনআরসি তালিকা হলে আইনের মারপ্যাঁচে তাঁরা নিজেদেরকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করতে বেগ পোহাতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রমাণ করা অসম্ভবও।

এমতাবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হলে নিশ্চিতভাবে কয়েক লক্ষ মুসলিম বাঙালি তালিকা থেকে বাদ পড়বেন এবং নতুন নাগরিক আইন অনুযায়ী তাদের নাগরিকত্ব লাভের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তারা বিদেশি তথা বাংলাদেম থেকে আগত বলে বিবেচিত হবেন।

একদিকে আসামের ৬ লক্ষ মুসলমান, অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ, ভারত এই বিরাট সংখ্যক মুসলমানকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার গরজ দেখাবে না স্বাভাবিকভাবেই। ফলে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশে পুশব্যাক কিংবা গণহত্যা এই দুটোর যেকোনো একটি কিংবা উভয়টিই বেছে নেবে তারা। যেমনটা হয়েছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ এম্নিতেই ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিয়ে মুশকিলে আছে, নতুনভাবে যখন আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও ততোধিক সংখ্যক শরণার্থী বানের জলের মতো ঢুকতে থাকবে, তখন শরণার্থীর ভিড়ে সমস্যা কতখানি প্রকট হয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়।

এর বাইরে এই মুসলিম নিধনযজ্ঞের ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যেও ক্ষোভ এবং চূড়ান্ত প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটবে, যা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে প্রচণ্ডভাবে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি অস্থিতিশীল একটি পরিবেশ বিরাজ করবে দেশজুড়ে। অনেকাংশে অনিবার্য হয়ে উঠবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও।

হামমাদ রাগিব, তরুণ আলেম ও সংবাদিক


আপনার মতামত লিখুন :
মতামত এর আরও খবর

আরো পড়ুন
ফ্রান্স সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী বাংলাদেশী  সরুফ ছদিওল

ফ্রান্স সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী বাংলাদেশী  সরুফ ছদিওল

ফ্রান্সে আগামী ১৫ মার্চ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আর এ নির্বাচনে…

পর্তুগাল আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংঘর্ষে আহত ৬ নিহত ১

পর্তুগাল আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংঘর্ষে আহত ৬ নিহত ১

পর্তুগাল গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার রাজনীতি পূর্বশত্রুতার জের ধরে বিএনপির সভাপতি…

মা কোলে নিতেই নড়ে উঠলো মৃত বলে ফেলে রাখা নবজাতক!

মা কোলে নিতেই নড়ে উঠলো মৃত বলে ফেলে রাখা নবজাতক!

চুয়াডাঙ্গা শহরের হাসপাতাল সড়কের ‘উপশম নার্সিং হোম’-এ নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে…

বড়লেখায় একসাথে ৫ খুন

বড়লেখায় একসাথে ৫ খুন

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।…

তিন তলা থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

তিন তলা থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

সাভারের আশুলিয়ায় একটি ভবনের তিন তলা থেকে পড়ে রাস্তার উপর…

পর্তুগাল আওয়ামী বিএনপি দুই গ্রূপের সংঘর্ষ, আহত ৪

পর্তুগাল আওয়ামী বিএনপি দুই গ্রূপের সংঘর্ষ, আহত ৪

রাজনৈতিক দলীয় শত্রুতার জেরে গতকাল পর্তুগাল স্থানীয় সময় রাত ৯টার…

বিজেপি নেতাকে কষে চড় হাঁকালেন নারী কর্মকর্তা

বিজেপি নেতাকে কষে চড় হাঁকালেন নারী কর্মকর্তা

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ছিল, তারপরও বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের সমর্থনে মিছিল বের…

পেঁয়াজের দাম আরও কমেছে

পেঁয়াজের দাম আরও কমেছে

দীর্ঘদিন ধরে চড়া দামে বিক্রি হওয়া দেশি পেঁয়াজের দাম সপ্তাহের…